বিতর্কটা হয়েছিল লালবাগ মাদরাসায়। খতমে বুখারির দিন। একজন জেনারেল শিক্ষিত ভদ্রলোকের সাথে। তিনি সম্ভবত ফরহাদ মাযহারের পাঠচক্রের সমন্বয়ক ছিলেন। তার মতে, শুধু অনুবাদ পড়েই কুরআনকে পরিপূর্ণ হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব। আমার অবস্থান ছিল তার বিপরীতে।

ভদ্রলোককে আমি প্রশ্ন করলাম, সুরা ফাতেহার প্রথম অংশ ‘আলহামদুলিল্লাহ’ থেকে আপনি কি বুঝেন? তিনি বললেন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমি বললাম, আমি শুধু এতোটুকুই বুঝি না। বরং এর থেকে এছাড়াও আমি আরো যা যা বুঝি তা হল, আল্লাহ তাআলা জীবিত। তার প্রসংশা সমূহ কারো প্রদত্ত নয় বরং অনাদি। এই প্রশংসা অস্থায়ী নয় বরং চিরস্থায়ী ইত্যাদি। তিনি বললেন, সেটা কিভাবে? বললাম, আরবিতে হামদ শব্দটি এমন সত্তার জন্য ব্যবহার হয় যিনি জীবিত। মৃত কারো জন্য এটি ব্যবহার হয় না। তারজন্যে মাদাহ শব্দ রয়েছে। এমনি ভাবে এটি মূলত ছিল ‘নাহমাদুল্লাহা’ বা আমরা আল্লাহর প্রশংসা করছি। এটাকে ফেয়েল (verb) বা কর্ম থেকে সরিয়ে ইসিম (noun) হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আরবি ব্যকরণে একে জুমলায়ে ইসমিয়ায়ে ফে’লিয়া বলে। ফলে প্রশংসাটা স্থায়ী রূপ পেয়েছে। কারণ কর্মের মধ্যে স্থায়ীত্ব পাওয়া যায় না। যে কোন কাজই কর্তা কিছুক্ষণ করার পর সাময়িকের জন্য হলেও বিরতি দেয়। ফলে তা স্থায়ী থাকে না। ক্ষণিকের জন্য হলেও তাতে ভাটা পড়ে। সুতরাং আয়াতে এভাবে প্রকাশের ফলে প্রসংশাটা আল্লাহর জন্য বিরতিহীনভাবে সব সময়ের জন্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। এমনিভাবে হামদ শব্দটি বুঝায় যেসব কারণে তিনি প্রশংসিত হচ্ছেন তা কারো প্রদত্ত নয়। বরং শুরু কাল থেকেই তার সেগুলো অর্জিত আছে।

কুরআনে নাবিদের জন্য ‘নাযির’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যার বাঙলা অনুবাদ করা হয় ভীতিপ্রদর্শনকারী। অথচ এর দ্বারা শব্দটির পূর্ণ মর্মার্থ সুস্পষ্ট হয় না। কারণ সাপ-বিচ্ছু ও সন্ত্রাসী-ডাকাতরাও আমাদের ভয় দেখায়। আবার মা-বাবা ও উস্তাদরাও মন্দকাজ থেকে বেঁচে থাকার জন্য ভয় দেখান। দুই প্রকার ভয়ের ধরন কি এক হল? আরবিতে কিন্তু প্রথম প্রকারের ভীতিপ্রদর্শনকারীকে বলে মুখিফ। আর দ্বিতীয় প্রকারের ভীতিপ্রদর্শনকারীকে বলে নাযির। তারমানে নাযিরের মধ্যে যে ভীতিপ্রদর্শন তার সাথে দয়া-মায়া এবং দরদ ও কল্যাণকামিতা থাকে। এর দ্বারা নাবিদের দাওয়াতের পদ্ধতিটাও আমাদের সামনে ফুটে উঠে। একটা শব্দ থেকেই এতো কিছু বুঝতে পারলাম। কিন্তু শব্দটার শুধু বাঙলা অনুবাদ দিয়ে কি এতো কিছু বুঝা সম্ভব? কখনোই না। সেজন্যই আমি বলেছিলাম, আরবি ছাড়া কুরআন পরিপূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব নয়। হয়ত সাময়িক কিছু জ্ঞান অর্জন হবে। তবে সেটাকে পরিপূর্ণ হৃদয়ঙ্গম বলা যায় না। তাছাড়া মুফাসসিরিনে কেরাম তাফসিরের জন্য যেসব শর্তারোপ করেছেন তারমধ্যে একটা হল, আরবি ভাষায় পারদর্শী হওয়া। শুধু অনুবাদ যথেষ্ট হলে তারা কখনোই এই শর্তারোপ করতেন না।

Taken from the facebook page of Abdullah Al Masud

ও আল্লাহ, ও আমার শিক্ষক, আমাদেরকে কোরআন পরিপূরনভাবে বোঝার সামর্থ্য দান করো। আমিন।